সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৪৮ অপরাহ্ন
জরুরী নোটিশঃ
Wellcome to our website...

ডিজিটাল হুন্ডিতে সর্বনাশ

রিপোর্টারের নামঃ / ৬০ টাইম ভিউ
আপডেটঃ বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০২২, ১:২৪ পূর্বাহ্ন

ডিজিটাল হুন্ডি সর্বনাশ ডেকে আনছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের নিরাপদ মাধ্যম এখন ডিজিটাল হুন্ডি। এসব অর্থ পাচারে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’, ‘রকেট’, ‘উপায়’, ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের টার্গেট করে এ তৎপরতা চালাচ্ছে। গত এক বছরেই ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। প্রবাসীদের লোভনীয় সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে বিকাশ, রকেট, উপায়, নগদ তাদের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একাধিকবার সতর্ক করা, এমনকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বন্ধ হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলোর অবৈধ এ তৎপরতা। ফলে দেশে আসছে না আশানুরূপ রেমিট্যান্স। গত সেপ্টেম্বরে ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।সিআইডির তদন্তে বলা হয়েছে, গত এক বছরে ডিজিটাল হুন্ডিতে পাচার হয়েছে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের ৫ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে এসব টাকা পাচার হয়েছে। হুন্ডিতে জড়িতরা বেছে নিয়েছেন বিকাশ, রকেট, উপায়, নগদের অ্যাপ। এসব অ্যাপের মাধ্যমে চলে হুন্ডির লেনদেন। শুধু হুন্ডির লেনদেনই নয়, বিভিন্ন গেমিং, জুয়া খেলার জন্য ব্যবহার হয় এসব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাপ। অনলাইনে বৈদেশিক মুদ্রার বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে নগদ ডলার। এতে কমছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সম্প্রতি ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে মুদ্রা পাচারে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের  সিআইডি ও বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউর তদন্তে দেখা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বিকাশ, নগদসহ এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নামে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা হচ্ছে। হুন্ডি চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশি এজেন্টের কাছে অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসীদের সুবিধাভোগীদের এমএফএস অ্যাকাউন্ট নম্বর ও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে এসএমএস পাঠাচ্ছেন। এখানকার এজেন্ট সুবিধাভোগীর নম্বরে ক্যাশ ইন করে দিচ্ছেন। এতে প্রবাসীদের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে আসছে না। অনলাইন গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোট্রেডিং বা অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে এমএফএস ও কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় কিছু অসাধু এমএফএস এজেন্টের কাছে এসে ক্যাশ আউট করে খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে ওইসব অনলাইন সাইটের পরিচালনাকারীদের কাছে পাচার করছে। জানা গেছে, এমএফএস প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে ডিজিটাল হুন্ডি এবং অবৈধ গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোট্রেডিং বা অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিং-সংক্রান্ত লেনদেন চিহ্নিত করতে মোট ৪ লাখ এমএফএস এজেন্টের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। এসব এজেন্টের লেনদেন বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫০৫টি সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা হয়। এসব নির্দেশকের একটি হলো- যেসব এজেন্ট নম্বরের মোট লেনদেনের ৯০ শতাংশ বা তার বেশি শুধু ক্যাশ ইন হয়েছে। মোট লেনদেনের ৯০ শতাংশের বেশি, যেখান থেকে শুধু ক্যাশ আউট হয়েছে, এক মিনিটে চারটি বা তার বেশি ক্যাশ ইন এবং রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে ক্যাশ ইন। এভাবে বিকাশের ৬৯ হাজার ৬১৩টি, উপায়ের ৩৮ হাজার ৮৩৫টি, রকেটের ৩৮ হাজার ৩৫৮টি এবং নগদের ৩৪ হাজার ৩৫৮ এজেন্টকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বারবার তদন্তে বিভিন্ন কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও একই তৎপরতা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। যেভাবে হুন্ডি হয় : সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, একটি মোবাইলেই ৯ হাজার ৮৮৮টি অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু একজনের মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস এজেন্ট নম্বরে এসব অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ১ এপ্রিল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ওই এজেন্ট নম্বর থেকে বিভিন্নজনের কাছে ৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯ টাকা পাঠানো হয়েছে। এমন পরিমাণের লেনদেন হয়েছে অন্তত ৪৬টি এজেন্ট নম্বর থেকে। এসব নম্বরের অবস্থান ঢাকার নবাবগঞ্জ, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও চট্টগ্রামে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর নবাবগঞ্জ থেকে ফজলে রাব্বিকে এবং মোহাম্মদপুর থেকে শামীমা আক্তারকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তাদের জিজ্ঞাসবাদ করে বিভিন্ন অ্যাপস ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও আটজনের তথ্য পান সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা। হুন্ডিগুলো হয় টিএমআই নামে একটি অ্যাপসে। তারা হলেন- টিএমআই অ্যাপসের পরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি ইতালির রোমে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে অবস্থান করা আরেক পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন। তার বাড়ি পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ঢালকা নগর। মিজানের স্ত্রী ঢাকার নবাবগঞ্জের মীর মিথিলা। এ ছাড়া সুমন, সবুজ, সূর্য বাবু, আসলাম খান, সজীবসহ আরও ২০-২৫ জনের নাম পাওয়া যায়। এরা সবাই পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে ৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন সাইবার পুলিশ সেন্টারের এসআই মেহেদী হাসান। সিআইডির হাতে গ্রেফতার ফজলে রাব্বি তাদের জানিয়েছেন, ইতালির রোমে থাকা মিজান টিএমআই ও টপআপটুয়েন্টিফোর ডট ইনফো নামের ওয়েব অ্যাপসে হুন্ডি লেনদেন করেন। বাংলাদেশে লেনদেন সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য শামীমাকে অ্যাডমিন নিয়োগ দেন। কোন নম্বরে কত টাকা ক্যাশ ইন হবে তা টিএমআই অ্যাপসের মাধ্যমে ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়। আর সেই পরিমাণ টাকা সজীব ঢাকার বান্দুরায় এনআরবিসি ব্যাংকের শাখায়, প্রাইম ব্যাংকের জয়পাড়া শাখায়, অগ্রণী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখায়, আইএফআইসি ব্যাংকের জয়পাড়া শাখার অ্যাকাউন্টে জমা করেন। মিজানুরের নির্দেশনা অনুযায়ী রাব্বি যেসব নম্বরের বিকাশে ক্যাশ ইন করতেন সেসবের তথ্য মিথিলা ও সুমনের কাছে পাঠাতে হতো। এদিকে শামীমা জানিয়েছেন, তিনিই মূলত সমগ্র বাংলাদেশের টিএমআই অ্যাপসের হুন্ডি দেখেন। তাদের আরেক পরিচালক জাহাঙ্গীর মিথিলার বড় ভাই। টিএমআই অ্যাপসে বিকাশ প্রভাইডারদের আইডি খোলা বন্ধসহ সব সমস্যার সমাধান তিনিই করেন। ইতালিকেন্দ্রিক ব্যবহৃত টিএমআই ও টপআপটুয়েন্টিফোর ডট ইনফো নামের অ্যাপসটি ছাড়াও হুন্ডির জন্য সৌদি আরবকেন্দ্রিক ‘ইজিক্যাশ’ নামে আরেকটি অ্যাপস আছে। এ অ্যাপসে সৌদিতে টাকা পাঠাতে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক এজেন্টরা জড়িত। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে ডলারের সংকট চলছে। এ সংকটের মধ্যে হঠাৎ দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানো বাড়লেও রেমিট্যান্স কমছে। আবার বিদেশ ভ্রমণ নানাভাবে নিরুৎসাহ করার পরও দেশের বাজারে নগদ ডলারের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে, যা গত সাত মাসের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই, আগস্ট) টানা ২ বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স আসে দেশে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও রেমিট্যান্সের সে ধারা অব্যাহত ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আসে ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। দ্বিতীয় মাস আগস্টে ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ (২ দশমিক ৩ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। সেপ্টেম্বরে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মোট ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ ডলার বা প্রায় ১.৫৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের (২০২১ সালের সেপ্টেম্বর) একই সময়ের চেয়ে ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, ‘ডিজিটাল হুন্ডির বিরুদ্ধে চালিত অভিযানের পর তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটির তদন্ত করছে সাইবার এবং একটি তদন্ত করছে ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইউনিট। তবে ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আমাদের নজরদারিতে আছেন।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল হুন্ডি বা অর্থ পাচারের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। ডিজিটাল আর্থিক সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেসব নিয়ে কাজ করছি।


এই বিভাগের আরো খবর